নিষিদ্ধ সীমানা

« <
29
> »

নিষিদ্ধ সীমানা | Nishiddho Simana
তাসনিম রিয়া খান


পর্ব: ১

যে বিয়েকে ঘিরে পুরো দেশের মিডিয়া উৎসবে মেতেছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই একই বিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির শিরোনাম হবে—তখনও কেউ কল্পনাও করেনি।

আজ প্রাক্তন এমপি শাহ আলম চৌধুরীর বড় কন্যা আকসা চৌধুরীর বিয়ে। কাকতালীয়ভাবে আজই তার আঠারোতম জন্মদিনও। তবে এই আঠারোতম দিনে বিয়েটা কি আসলেই শুধুই এক কাকতালীয় সংযোগ? নাকি বহু বছর আগে নেওয়া কারও একটি সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের শেষ অধ্যায়ের সূচনা? সেই উত্তর তখনও অজানা ছিল আকসার কাছে। যে বয়সে বেশিরভাগ মেয়ের জীবনে কেবল স্বপ্নের রং গাঢ় হওয়ার কথা, সেই বয়সেই আকসার জীবনে বসেছে বিয়ের রাজকীয় আসর। তার বর দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেনের একমাত্র উত্তরসূরি সাদমান হোসেন। চৌধুরী প্যালেসের সদর দরজার সামনে মিডিয়ার উপচে পড়া ভিড়। পুরো বাড়িটা অর্কিডসহ নানান ধরনের ফুল আর ঝাড়বাতির সোনালি আলোয় এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন আজ এখানে কোনো সাধারণ বিয়ে নয়—ক্ষমতা, প্রভাব আর ঐশ্বর্যের এক রাজকীয় প্রদর্শনী বসেছে। বাড়ির সামনের রাস্তা জুড়ে পুলিশের গাড়ি, মিডিয়ার ভ্যান, পার্টির নেতাকর্মীদের আনাগোনা, শহরের নামিদামি লোকজনের ব্যস্ত পদচারণা—সব মিলিয়ে চারপাশে এক অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা। দেশের প্রথম সারির প্রতিটি নিউজ চ্যানেল আর অনলাইন পোর্টাল লাইভ কভারেজ দিচ্ছে। তবে মিডিয়ার এই তুমুল মাতামাতির কারণ কেবল সাবেক এমপির প্রতিপত্তি নয়, আসল কারণ সাখাওয়াত হোসেন। তিনি নিজের বিপুল অর্থ আর ক্ষমতার জোরে পুরো মিডিয়া জগতকে যেন এখানে এনে দাঁড় করিয়েছেন। নিজের সামাজিক আভিজাত্য আর প্রভাবের ঢাকঢোল পেটানোর এমন মোক্ষম সুযোগ যেন দেশের এই শীর্ষ ব্যবসায়ী হাতছাড়া করতে চাননি।

আকসা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখছিল। লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠা মুখটা দেখে নিজেই চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল বারবার। নিখুঁত মায়াবী এক রূপ! হালকা গহনা আর ছিমছাম সাজের সাথে তার ঘন কালো চুলগুলো খোঁপা করা, আর মাথায় জড়ানো লাল বেনারসির ওড়না। গায়ে লাল টকটকে বেনারসি, কপালে ঝোলানো হিরের টিকলি আর স্নিগ্ধ সাজে তাকে কোনো ডিজনি প্রিন্সেসের চেয়ে কম লাগছে না।

পাশ থেকে ইফতি বলে উঠল,

“উফ! আমি মেয়ে হয়েও তোর দিক থেকে চোখ সরাতে পারছি না রে আকু। মনে হচ্ছে তোকে আমিই তুলে নিয়ে বিয়ে করে ফেলি। ছেলে হলে আজ নির্ঘাত তোকে ডেসপারেটলি ছিনতাই করে নিতাম।”

পাশ থেকে অন্য একজন হেসে যোগ করল,

“আজকে আমাদের পাত্রীকে দেখে জামাইবাবুর হোশ যে উড়বে, সেটা লিখে রাখতে পারিস!”

ইফতি চোখ টিপে বলল,

“জামাইবাবুর হোশ তো সেই তিন মাস আগেই উড়ে গেছে, যেবার আকুকে প্রথমবার দেখেছিল।”

একের পর এক বান্ধবীর রসিকতায় চারপাশে হাসির রোল উঠল। আকসা লজ্জায় মুখটা আরও নিচু করে নিল। রিমি দূর থেকে বড় বোনকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছিল। তবে বেশিক্ষণ সেখানে থাকল না, চলে গেল। তার আপু আজকে থেকে পরের বাড়ি চলে যাবে—কথাটা ভাবতেই তার চোখ জ্বলে উঠছে। গাল ভিজিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটার মতো। ঠিক তখনই আকসার ফোনটা বেজে উঠল—ভিডিও কল এসেছে। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে ‘সাদমান’ নামটা।

এতগুলো মানুষের সামনে ভিডিও কল ধরার মতো সাহস আকসার হলো না। লোকটার নির্ঘাত বুদ্ধি নেই, না হলে এই সময় কেউ ভিডিও কল করে নাকি! লজ্জায় যেন এখনই সে মরে যাবে! সে দ্রুত কলটা কেটে দিতেই একটা টেক্সট মেসেজ ভেসে উঠল স্ক্রিনে—

“রাঙাবউ, আপনাকে বউ সাজে দেখার জন্য তর সইছে না। কলটা তুলছেন না কেন?”

মেসেজটা পড়তেই আকসা লজ্জায় ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল। সাদমানের সঙ্গে যেদিন প্রথম দেখা হয়েছিল, সেদিন আকসার গায়ে ছিল লাল রঙের পোশাক। সামনাসামনি বসে থাকা মেয়েটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে হঠাৎই সে বলে উঠেছিল, “আপনাকে দেখে একদম রাঙাবউ মনে হচ্ছে।”

কথাটা শুনে আকসা সেদিন এতটাই অপ্রস্তুত আর বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল যে সঙ্গে সঙ্গে চোখ কুঁচকে তাকিয়েছিল তার দিকে। কিন্তু সাদমান তাতেও একটুও দমে যায়নি। উল্টো নিজের কথাতেই বড্ড মজা পেয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলেছিল, “বিয়ের পর আমি আপনাকে এই নামেই ডাকব। কারণ এই লাল রঙ, এই রাগে টকটকে হয়ে ওঠা মুখ—সব মিলিয়ে আপনি পুরোপুরি আমার রাঙাবউ।”

পরে একেবারে নির্লজ্জ ভঙ্গিতেই জানিয়ে দিয়েছিল, বিয়ের পরে আকসাকে সে সারাজীবন এই নামেই ডাকবে। তার ভাষায়, ‘রাঙাবউ’ নামটার মধ্যে এমন এক অদ্ভুত মায়া আছে, যা উচ্চারণ করলেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল রঙে মোড়া, রাগে-লজ্জায় রাঙা এক মুখ—আর সেই মুখটার সঙ্গে নাকি আকসার অদ্ভুত রকম মিল আছে।

আকসা ঠোঁট কামড়ে দ্রুত আঙুল চালিয়ে টাইপ করল—

“বিয়েটা এখনো হয়নি, মিস্টার। সো, রাঙাবউ ডাকাটা বিয়ের পরের জন্য জমিয়ে রাখুন।”

এরই মাঝেই হঠাৎ বাইরে শোরগোল উঠল, “বর এসেছে! বর এসেছে!”

মুহূর্তের মধ্যে ঘরের সব বান্ধবীরা হইহই করে ঘর ছেড়ে বাইরের লনের দিকে ছুটে গেল। আকসা ঘরের ভেতর একলা হয়ে পড়ল। কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে ধীর পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল, নিচে লনের দিকে একটু উঁকি দিল। গাড়ি থেকে নামছে সাদমান। পরনে শেরওয়ানি, তবে হাতটা ফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত। কিছু একটা টাইপ করছে সে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আকসার হাতের ফোনটা ‘টু টু’ শব্দে কেঁপে উঠল। নতুন মেসেজ—

“মনে হচ্ছে আমাকে বিয়ে না করার ধান্দায় আছেন? থাকলেও লাভ নেই। দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকেন, খুঁজে বের করে ঠিকই বিয়ে করে নেব। You have no choice, because I am your only destiny.”

আকসা ঠোঁট চেপে হাসল। এই পুরুষটার প্রতিটা কথায় এক অদ্ভুত সম্মোহন আছে, যা তাকে মুগ্ধ করে। অথচ শুরুর গল্পটা এমন ছিল না। তিন মাস আগে তার বাবা শাহ আলম চৌধুরী তাকে ডেকে খুব গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, “তোমার জন্য বিয়ে ঠিক করেছি। আশা করি আমার অমতে যাবে না। গেলেও আমি শুনবো না।”

ব্যস, এতটুকুই। কথাটা বলেই তিনি যেন নিজের দায়িত্ব শেষ করে ফেলেছিলেন। আকসাকে কিছু বলার, এমনকি অবাক হওয়ার সুযোগটুকুও দেননি। সেদিন বাবার ওপর মনে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে আকসা সাদমানের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল তার সাথে চরম দুর্ব্যবহার করা, তপ্ত বাক্যবাণ শোনানো, যাতে ছেলেটা নিজেই বিয়ে ভেঙে পালিয়ে যায়। কিন্তু আকসার সমস্ত রুক্ষ আচরণ আর তপ্ত বাক্যবাণ হজম করেও সাদমান শুধু অদ্ভুত এক টুকরো মুচকি হেসেছিল। সাদমানের সেই অস্বাভাবিক ধৈর্য, ব্যক্তিত্ব আর চোখের ভাষা খুব অদ্ভুতভাবে আকসার ভেতরের প্রতিরোধগুলো একে একে ভেঙে দিয়েছিল। অমত থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল এক সুন্দর বন্ধুত্ব, তারপর হয়তো তার চেয়েও গভীর কিছু। কিন্তু সেটা কি? তা তার জানা নেই। হয়তো, নতুন এই মানুষটাকে ঘিরে জন্ম নেওয়া অচেনা অনুভূতি বোঝার মতো সময়ই সে পায়নি।

পুরোনো কথা ভেবে আকসা যখন আপনমনে হাসছিল, ঠিক তখনই তার রুমের দরজার লকটা হালকা শব্দে খুলে গেল। আকসা ভাবল, সকলে হয়তো বর দেখে আবার রুমে ফিরে এসেছে। কিন্তু পেছনে ঘুরতেই তার পুরো শরীর হিম হয়ে গেল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চারজন সুঠাম দেহের নারী। তাদের চওড়া কাঁধ আর পেশিবহুল শরীর দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা সাধারণ কেউ নয়, নিয়মিত জিম করা লেডি বাউন্সার। তাদের পেছনে কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা দুজন সুঠাম পুরুষ।

আকসা ভয়ে পিছিয়ে গেল,

“আপনারা কারা? এখানে কী চান?”

তাদের মধ্যে একজন গম্ভীর গলায় বলে উঠল,

“ভাই আপনারে নিতে পাঠাইছে।”

আকসা অবাক গলায় বলল,

“কে ভাই? কোন ভাই? আমাকে কেন নিতে পাঠাবে সে?”

পাশের হ্যাবলামার্কা লোকটা তখন নিজের মাথাটা হালকা চুলকে, কিছুটা লাজুক মুখে বলল,

“আমাদের ফুলের মতো চরিত্রবান ভাই—এমপি ওয়াসিম সাইদ।”

পর্ব: ২

রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে তিনটা কুচকুচে কালো এসইউভি গাড়ি। প্রথম গাড়িটার ঠিক সামনে উইন্ডশিল্ডের ওপর উড়ছে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা—কোটি মানুষের আবেগ, রক্ত আর সবুজের ত্যাগ জড়ানো এক চিরন্তন ইতিহাস। যা এই মুহূর্তে এক চরম অপরাধীর গাড়ির শোভা বাড়াচ্ছে। বনেটের ওপর বড় বড় রুপালি অক্ষরে খোদাই করা—এমপি ওয়াসিম সাইদ।

মাঝখানের কালো গাড়িটার বডিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে

« <
29
> »